প্রশ্নঃ হিন্দুরা যে বহু দেব-দেবীর পূজা করেন সেটি যথার্থ? না কি একমাত্র কৃষ্ণপূজা করলেই আর নতুন করে কোনও দেব-দেবীর পূজার প্রয়োজন নেই?

প্রশ্নঃ হিন্দুরা যে বহু দেব-দেবীর পূজা করেন সেটি যথার্থ? না কি একমাত্র কৃষ্ণপূজা করলেই আর নতুন করে কোনও দেব-দেবীর পূজার প্রয়োজন নেই?

উত্তরঃ হিন্দুরা মহাভারতকে তাদের ধর্মশাস্ত্র বলে মানে। মহাভারতের ভীষ্মপর্বে উত্তর গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উক্তি রয়েছে--
দেবাদীনঞ্চ পূজ্যোঽহং বর্ণাদীনাং ধনঞ্জয়।
মৎপূজনেন সর্বার্চা স্যাদ্‌ধ্রুবং নাত্র সংশয়॥
”আমি সমস্ত দেবদেবীর এবং সকল বর্ণের সকল আশ্রমের ব্যক্তিগণের পূজ্য। আমার পূজাতে নিশ্চিতভাবে সকলেরই পূজা হয়, এতে কোনও সন্দেহ নেই।”

ঋক্ বেদের কৃষ্ণোপনিষদে বলা হয়েছে---
ওঁ কৃষ্ণো বৈ সচ্চিদানন্দঘনঃ, কৃষ্ণ আদিপুরুষঃ, কৃষ্ণঃ পুরুষোত্তমঃ, কৃষ্ণো হা উ কর্মাদিমুলং, কৃষ্ণঃ স হ সবৈকার্যঃ, কৃষ্ণঃ কাশং কৃদাদীশমুখপ্রভুপূজ্যঃ, কৃষ্ণোঽনাদি তস্মিন্নজাণ্ডন্তর্বাহ্যে যন্মঙ্গলং তল্লভতে কৃতী।
অর্থাৎ ”কৃষ্ণই সচ্চিদানন্দঘন, কৃষ্ণ আদি পুরুষ, কৃষ্ণ কর্মাদির মূল, কৃষ্ণ সকলের একমাত্র প্রভু, কৃষ্ণই ব্রহ্ম-বিষ্ণু-শিবাদি ঈশ্বর প্রমুখ দেবগনের প্রভু ও পূজ্য, কৃষ্ণ অনাদি, ব্রহ্মাণ্ডের অন্তরে ও বাইরে যত মঙ্গল-সেই সমস্তই কৃষ্ণসেবক কৃতী ব্যক্তি শ্রীকৃষ্ণেই লাভ করে থাকেন।

শ্রীভগবানের আরাধনা ব্যতীত অন্য  সমস্ত কিছুই নশ্বর এবং তুচ্ছ বলে হেয়। শ্রীমদ্ভাগবতে দেবতাগণ শ্রীহরির স্তুত করে বলেছেন---
অবিস্মিতং তং পরিপূর্ণ-কামং
স্বেনৈব লাভের সমং প্রশান্তম্।
বিনোপসর্পত্যপরং হি বালিশঃ
শ্বলাঙ্গুলেনাতিতিতর্ত্তি সিন্ধুম্॥

অর্থাৎ, ”যে ব্যক্তি অবিস্ময়ে অর্থাৎ সুনিশ্চিত রূপে স্বীয় লাভে পরিপূর্ণকাম বা সমগ্রবৈভব সমন্বিত ও প্রশান্ত শ্রীগোবিন্দকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে উপাসনা করে, সেই মূর্খ নিশ্চয়ই কুকুরের লেজ ধরে মহামসুদ্র পার হবার চেষ্টা করছে।” (ভাঃ ৬/৯/২)
এই কথা শ্রীপদ্মপুরাণে বলা হয়েছে-

যথা ধৃত্বা শুনঃ পুচ্ছং তর্তুমিচ্ছেৎ সরিৎপতিম্।
তথা ত্যক্ত্বা হরিং সেব্যমন্যোপসনয়া ভবম্॥
অর্থাৎ, "অতিশয় অজ্ঞ ব্যক্তিরা কুকুরের লেজ ধরে সমুদ্র উত্তীর্ণ হতে ইচ্ছা করে, সেই রকম সেব্য শ্রীহরিকে পরিত্যাগ করে অন্য দেব-দেবী ইত্যাদির উপাসনা করে মূর্খতা জন্ম-মৃত্যুর ভব-সংসার উত্তীর্ণ হতে ইচ্ছে করছে।”

প্রকৃতপক্ষে শ্রীহরি ছাড়া কেউই সংসারবদ্ধ জীবকে দুঃখময় জড় জগৎ থেকে উত্তীর্ণ করতে পারে না । এই কথা দেবর্ষি নারদকে সদাশিব বলছেন---
ভুবনে সর্বলোকানাং নারাধ্যো বৈ হরিং বিনা।
ভবার্ণবচ্ছিন্নকোহপি সর্বকামদকামদঃ॥
অর্থাৎ, “এই ভুবনে সকল লোকের হরি বিনা আর কেউ আরাধ্য নিশ্চয়ই নেই; ভগবান শ্রীহরি ছাড়া আর কেউই কামদগণের কামদ এবং ভবার্ণবছেত্তা নয়।” ভগবান শ্রীহরি হচ্ছেন সর্বকামদকামদ অর্থাৎ যে কোনও সর্বকামদাতা দেবতারও অভীষ্ট দাতা এবং ভবার্ণছেত্তা অর্থাৎ সমস্ত জীবের সংসার বন্ধন স্বরূপ বারবার জন্মমৃত্যুর ভবচক্রের একমাত্র ছেদনকারী।

মহাভারতে হরিবংশে বলা হয়েছে---
বাসুদেবং পরিত্যজ্য যোহন্যদেবমুপাসতে।
ত্যক্ত্বামৃতং স মূঢ়াত্মা ভুঙক্তে হালাহালং বিষম্॥

অর্থাৎ, “যে মূঢ়াত্মা বাসুদেব শ্রীহরিকে পরিত্যাগ করে মোগবশত অন্য দেবতার উপাসনা করে, সে অমৃত ছেড়ে সংসার যাতনা রূপ বিষ ভক্ষণ করে।”

শ্রীস্কন্দ পুরাণে বলা হয়েছে---
শ্রীহরির পূজা হলে তেত্রিশকোটি দেব-দেবীরও পূজা হয়ে যায়, আলাদা করে কারও পূজার প্রয়োজন নেই ।
অর্চিতে দেবদেবশ অজশঙ্খগদাধরে।
অর্চিতাঃ পিতরোদেবা যতঃ সর্বময়ো হরিঃ॥
অর্থাৎ, “পদ্ম-শঙ্খ-গদাধর, সমস্ত দেব-দেবীর ঈশ্বর শ্রীভগবান অর্চিত হলে দেবগণ ও পিতৃগণ সকলেই অর্চিত হন, যেহেতু শ্রীহরি সর্বময়।”

শ্রীমদ্ভাগবতেও তাই বলা হয়েছে, গাছের গোড়ায় জল দিলে শাখাপ্রশাখা ফল ফুল পাতায় জল দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সেগুলি গোড়ার জলেই পুষ্ট হবে। উদরে খাদ্য দিলে হাত পা চোখ নাক আপনাতেই পুষ্ট হবে, আলাদা করে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে খাদ্য দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তেমনই শ্রীহরির আরাধনা হলে সমস্ত দেব-দেবী প্রসন্ন হন। গোড়া বাদ দিয়ে আগায় জল দিলে গাছ নষ্ট হয়, পেট বাদ দিয়ে হাত পায়ে নাকে কানে খাদ্যবস্তু দিলে শরীর টিকে না, তেমনি ভগবান শ্রীহরিকে বাদ দিয়ে দেব-দেবীর আরাধনায় প্রকৃত মঙ্গল হয় না।

Post a Comment

0 Comments