
শ্রীমদ্ভাগবত ১০/৯/২২-২৩ শ্লোকের বর্ণনা অনুযায়ী, "শ্রীল শুকদেব গৌস্বামী পরীক্ষিৎ মহারাজকে বললেন,(শ্রীকৃষ্ণের বয়স তখন ৩ বছর চলমান) মা যশোদা যখন গৃহকার্যে ব্যস্ত ছিলেন,তখন ভগবান দামোদর শ্রীকৃষ্ণ যমলার্জুন বৃক্ষ দুটি দর্শন করেছিলেন,যাঁরা পূর্ব কল্পে দেবতাদের কোষাধ্যক্ষ কুবেরের পুত্র ছিলেন।পূর্বজন্মে নলকূবর এবং মণিগ্রীব নামে বিখ্যাত পুত্র দুজন অত্যন্ত ঐশ্বর্যশালী এবং সৌভাগ্যবান ছিলেন।কিন্তু গর্ব এবং অহঙ্কারের কারনে তাঁরা নারদ মুনির অভিশাপে বৃক্ষত্ব প্রাপ্ত হয়েছিলেন।"
এরপর শ্রীমদ্ভাগবত ১০/১০/১-৪৩ শ্লোকের বর্ণনা অনুযায়ী,"পরীক্ষিৎ মহারাজ জিজ্ঞাসা করলেন,হে পরমারাধ্য মুনিবর, কি কারনে নারদ মুনি নলকূবর এবং মণিগ্রীবকে অভিশাপ দিয়েছিলেন?তাঁরা কি এমন নিন্দনীয় কর্ম করেছিলেন,যার ফলে দেবর্ষি নারদ ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন? দয়া করে আপনি আমার কাছে তা বর্ণনা করুন।
শুকদেব গোস্বামী বলতে লাগলেন,"হে মহারাজ পরীক্ষিৎ,কুবেরের সেই দুটি পুত্র শিবের পার্ষদত্ব লাভ করেছিলেন,এবং সেই পদগর্বে অত্যন্ত গর্বিত হয়ে তাঁরা কৈলাস পর্বতে মন্দাকিনীর তীরে সুরম্য উপবনে বারুণী নাম্নী মদিরা পান করে,মদঘূর্ণিত লোচনে নারীদের সঙ্গে পুষ্পশোভিত বনে বিচরণ করতেন।তখন তারা গান করলে নারীরাও সঙ্গে সঙ্গে গান করতেন।তাঁরা পদ্মবন সুশোভিত গঙ্গায় প্রবেশ করে, মত্ত হস্তী যেভাবে হস্তিনীদের সঙ্গে ক্রীড়া করে,সেইভাবে তারা যুবতীদের সঙ্গে বিহার করছিলেন(অথাৎ কুবেরের এই দুইপুত্র নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পবিত্র গঙ্গা নদীতে অবৈধ স্ত্রীসঙ্গে লিপ্ত হয়েছিল)।
হে মহারাজ পরীক্ষিৎ,তখন সেই কুমারদের সৌভাগ্যের ফলে ঘটনাক্রমে নারদ মুনি সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁদের মদঘূর্ণিত নেত্র দর্শন করে,তিনি তাঁদের অবস্থা বুঝতে পেরেছিলেন।নারদ মুনিকে দর্শন করে নগ্ন দেবকণ্যগণ লজ্জিত হয়েছিলেন, এবং অভিশাপের ভয়ে তাঁরা শীঘ্রই তাঁদের বসন পরিধান করেছিলেন।কিন্তু কুবেরের এই দুই পুত্র তা করেননি।পক্ষান্তরে,তাঁরা মুনিকে উপেক্ষা করে নগ্ন অবস্থায় রইলেন।
শ্রীনারদ উবাচ
ন হান্যো জুষতো জোষ্যান্ বুদ্ধিভ্রংশো রজোগুণঃ।
শ্রীমদাদাভিজাত্যাদির্যত্র স্ত্রী দ্যূতমাসবঃ ॥৮॥
-(শ্রীমদ্ভাগবতঃ১০.১০.৮)
শব্দার্থঃ শ্রীনারদ উবাচ - নারদ মুনি বললেন; ন-নেই; হি-বস্তুতপক্ষে, অন্যঃ-অন্য জড় ভোগ;
জুষতঃ-উপভোগকারীর; জোষ্যান্-জড় জগতের পরিপ্রেক্ষিতে আকর্ষণীয় বস্তু (বিভিন্ন প্রকার আহার, নিদ্রা, ভয় এবং মৈথুন); বুদ্ধিভ্রংশঃ- বুদ্ধিনাশক এই প্রকার ভোগ, রজঃগুণঃ-রজোগুণের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত; শ্রী-মদাৎ- ঐশ্বর্য থেকে; আভিজাত্য-আদিঃ- (জন্ম, ঐশ্বর্য, শ্রুত এবং শ্রী) এই চার প্রকার জড় ঐশ্বর্যের; যত্র-যেখানে; স্ত্রী-স্ত্রী; দ্যূতম্ -দ্যূতক্রীড়া; আসবঃ-সুরাপান।
অনুবাদঃনারদ মুনি বললেন, সমস্ত উপভোগ্য বিষয়ের মধ্যে ঐশ্বর্যের গর্ব যেভাবে বুদ্ধি নাশ করে থাকে,দেহের সৌন্দর্য, উচ্চকূলে জন্ম এবং বিদ্যা প্রভৃতির গর্ব সেইভাবে বুদ্ধি নাশ করে না।অশিক্ষিত ব্যক্তি যখন ধনমদে মত্ত হয়,তখন সে স্ত্রীসম্ভোগ,দ্যূতক্রীড়া এবং মদ্যপানে লিপ্ত হয়।
নলকূবর এবং মণিগ্রীব - এই দুটি যুবক ভাগ্যক্রমে মহান দেবতা কুবেরের পুত্র,কিন্তু মিথ্যা অহঙ্কার এবং সুরাপানে উন্মত্ত হওয়ার ফলে অধঃপতিত হয়েছে,যে কারনে তাঁরা নগ্ন হওয়া সত্ত্বেও বুঝতে পারছে না যে, তাঁরা নগ্ন।যেহেতু তারা বৃক্ষের মতো বিরাজ করছে(কারন বৃক্ষ নগ্ন কিন্তু তার কোন চেতনা নেই),তাই এই যুবকদ্বয় দুটি বৃক্ষের শরীর প্রাপ্ত হবে,এটিই তাদের উপযুক্ত দন্ড হবে।কিন্তু বৃক্ষ হওয়ার পর এবং মুক্ত হওয়া পর্যন্ত আমার কৃপায় তাদের পূর্বকৃত পাপকর্মের কথা তাদের মনে থাকবে।অধিকিন্তু,আমার অনুগ্রহে একশত দিব্য বৎসর পর তারা বাসুদেবকে প্রত্যক্ষভাবে দর্শন করবে এবং কৃষ্ণভক্তি পরায়ন হবে।
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন,এইভাবে বলে দেবর্ষি নারদ নারায়ন আশ্রম নামক তাঁর আশ্রমে গমন করেছিলেন এবং নলকূবর ও মণিগ্রীব যমজ অর্জুন বৃক্ষে পরিণত হয়েছিলেন।ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর শ্রেষ্ঠ ভক্ত নারদ মুনির বাক্যের সত্যতা সম্পাদনের জন্য যেখানে যমজ অর্জুন বৃক্ষ ছিল,ধীরে ধীরে সেখানে গমন করলেন।
শ্রীকৃষ্ণ বলতে লাগলেন,"যদিও এরা দুজন মহাধনবান কুবেরের পুত্র এবং তাদের সম্পর্কে আমার করনীয় কিছুই নেই,তবুও নারদ মুনি আমার অতি প্রিয় ভক্ত, এবং যেহেতু সে চেয়েছে যে,আমি তাদের সম্মুখে আসি এবং তাদের উদ্ধার করি,তাই আমি তা করব।এই বলে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুন বৃক্ষ দুটির মাঝখানে প্রবেশ করেছিলেন এবং যে উদূখলটির সঙ্গে তাঁকে বাঁধা হয়েছিল,তা বক্রভাবে বৃক্ষ দুটির মধ্যে আটকে গিয়েছিল। তাঁর উদরে বাঁধা উদূখলটিকে বলপূর্বক আকর্ষণ করে বালক শ্রীকৃষ্ণ বৃক্ষ দুটিকে উৎপাটিত করেছিলেন।কান্ড, পল্লব এবং শাখাসহ বৃক্ষ দুটি প্রবলভাবে কম্পিত হতে হতে প্রচন্ড শব্দ সহকারে ভূমিতে পতিত হয়েছিল।
তারপর,যেখানে অর্জুন বৃক্ষ দুটি ভূপতিত হয়েছিল,সেখানে বৃক্ষ দুটির মধ্যে থেকে মূর্তিমান অগ্নির মতো দুই মহাপুরুষ নির্গত হয়েছিলেন।তাঁদের শোভায় সর্বদিক আলোকিত হয়েছিল(তাদের দেহ থেকে
যে আলো প্রকাশ পাচ্ছিল তা চারদিক আলোকিত করছিল), এবং তাঁরা অবনত মস্তকে শ্রীকৃষ্ণকে প্রণতি নিবেদন করে কৃতাঞ্জলি সহকারে বিভিন্ন স্তব স্তুতি করছিলেন।"
এরপর শ্রীমদ্ভাগবত ১০/১১/১-৪ নং শ্লোকের বর্ণনা অনুযায়ী,"শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন,হে মহারাজ পরীক্ষিৎ,যমলার্জুন বৃক্ষ দুটি পতিত হলে, নন্দ মহারাজ আদি গোপেরা সেই ভয়ঙ্কর শব্দ শুনে বজ্রপাত হয়েছে বলে আশঙ্কা করে সেখানে গিয়েছিলেন।তাঁরা সেখানে এসে ভূতলে পতিত অর্জুন বৃক্ষ দুটি দেখতে পেলেন।যদিও তাঁরা দেখতে পেয়েছিলেন যে,বৃক্ষ দুটি নিপতিত হয়েছে,কিন্তু বিভ্রান্ত হওয়ার ফলে,তাঁরা বৃক্ষ দুটি পতনের কারন নির্ণয় করতে পারলেন না।
শ্রীকৃষ্ণ রজ্জুর দ্বারা আবদ্ধ হয়ে উদূখল আকর্ষণ করেছিলেন। কিন্তু সে বৃক্ষ দুটি উৎপাটন করল কি করে?প্রকৃতপক্ষে কে সেটি করেছে?এই ঘটনার সূত্রটি কোথায়?এই সমস্ত আশ্চর্যজনক বিষয় চিন্তা করে গোপেরা উদ্বিগ্ন এবং বিভ্রান্ত হয়েছিলেন।তখন সমস্ত গোপবালকেরা বলেছিল-কৃষ্ণই তা করেছে।সে যখন দুটি বৃক্ষের মাঝখানে যায়,তখন উদূখলটি বক্রভাবে তাদের মাঝখানে আটকে যায়,এবং শ্রীকৃষ্ণ সেই উদূখলটি আকর্ষন করায় বৃক্ষ দুটি পতিত হয়।তারপর দুজন অতি সুন্দর পুরুষ বেরিয়ে এসেছিল।আমরা স্বচক্ষে তা দর্শন করেছি।
গভীর বাৎসল্য প্রেমের ফলে,নন্দ মহারাজ প্রমুখ গোপেরা বালকদের কথায় বিশ্বাস করতে পারেন নি যে, শ্রীকৃষ্ণ এত আশ্চর্যজনকভাবে বৃক্ষ দুটি উৎপাটন করেছিলেন।তাঁদের মধ্যে কারও কারও মনে সন্দেহ হয়েছিল।তাঁরা ভেবেছিলেন,যেহেতু গর্গমুনি পূর্বে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন,কৃষ্ণ নারায়নের সমতুল্য হবে,তাই সে এই কার্য করতেও পারে।"
0 Comments