মাতা সরস্বতীর পরিচয়! কেন সরস্বতীপূজা করা হয়?



দেবী সরস্বতী হিন্দুধর্মের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পূজিত দেবী। তিনি বিদ্যা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সংগীত, কলা ও বাকশক্তির অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে পূজীত।

 দেবী সরস্বতীর পরিচয়ঃ

দেবী সরস্বতীকে ব্রহ্মার শক্তি (শক্তিস্বরূপা) বলা হয়। তিনি সৃষ্টির জ্ঞান ও চেতনার প্রতীক। যেখানে অজ্ঞতা ও অন্ধকার, সেখানে সরস্বতী আলো ও জ্ঞানের বাহক।

 নামের অর্থঃ
‘সরস্বতী’ শব্দের অর্থ—
‘সরস’ = প্রবাহমান
‘বতী’ = যিনি ধারণ করেন
অর্থাৎ, যাঁর মধ্যে জ্ঞান ও বাকশক্তি প্রবাহিত হয়।

রূপ ও প্রতীকঃ
দেবী সরস্বতী সাধারণত—
শ্বেতবস্ত্র পরিহিতা (পবিত্রতা ও নির্মলতার প্রতীক)
হাঁস বা রাজহাঁসের উপর আসীন (বিবেক ও সত্য-মিথ্যা বিচারের প্রতীক)
বীণা হাতে (সংগীত ও সৃজনশীলতার প্রতীক)
এক হাতে বেদ, অন্য হাতে জপমালা ও কলস ধারণ করেন
বাহন
তার বাহন হাঁস, যা নীর-ক্ষীর বিচার করতে পারে—এটি জ্ঞানী ব্যক্তির প্রতীক।

পূজা ও গুরুত্বঃ

সরস্বতী পূজা বিশেষভাবে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিল্পী ও জ্ঞানসাধকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
বসন্ত পঞ্চমী তিথিতে তাঁর পূজা অনুষ্ঠিত হয়
বিশ্বাস করা হয়, দেবী সরস্বতীর কৃপায় মানুষ বিদ্যা, বুদ্ধি ও সৃজনশীলতায় উন্নত হয়
আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
দেবী সরস্বতী আমাদের শেখান—
অজ্ঞতা ত্যাগ করে জ্ঞানের পথে চলতে
শুদ্ধ বাক্য ও সৎ চিন্তার চর্চা করতে
বিদ্যাকে অহংকার নয়, সেবার মাধ্যম করতে

👉সরস্বতী দেবী কে? কিভাবে চিন্ময় জগতে সরস্বতী দেবীর আবির্ভাব হয়েছিল?
‎ সরস্বতী দেবীঃ মাতা সরস্বতী হলেন বিষ্ণুপত্নি।তাঁকে বিদ্যা ও বুদ্ধির দেবী বলা হয়।তিনি প্রথমে চিন্ময় জগতের গোলক ধামে পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণ থেকে আবির্ভূত হয়েছিলেন।তাঁর চারটি হস্ত।চার হস্তের মধ্যে দুই হস্তে মাতা সরস্বতী  বীণাবাদনে রত,আর এক হস্তে পুস্তক শোভমান এবং অন্য হস্তে জপমালা।
‎এছাড়াও পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ যিনি হলেন স্বয়ং নারায়ন তাঁর পরিকল্পনায় মূল সরস্বতী তাঁর  অংশরুপে  জড় জগতে দুইরুপে আবির্ভূত হন।তাঁর প্রথম রুপ হল ব্রহ্মার পত্নীরুপে,যিনি  বৈদিক শাস্ত্রসমূহের রক্ষা ও সৃষ্টিকার্যে ব্রহ্মাকে সাহায্য কল্পে ব্রহ্মার মুখ থেকে তাঁর পত্নিরুপে আবির্ভূত হন।এবং অপরটি হল ধরণীতে নিখিল জীব ও জগতকে পবিত্র করতে সরস্বতী  নদী রূপে।
চিন্ময় জগতে  সরস্বতী দেবীর আবির্ভাবঃ পঞ্চম বেদরুপে প্রসিদ্ধ অষ্টাদশ মহাপুরাণের মধ্যে ব্রহ্মবৈবর্ত মহাপুরাণ অনুসারে  চিন্ময় জগতের গোলক  ধামে পরমাত্মা  শ্রীকৃষ্ণের মুখ থেকে প্রথম মাতা সরস্বতী আবির্ভূত হন।
‎        আবির্ব্বভূব তৎপশ্চান্মুখতঃ পরমাত্মনঃ। 
‎      একা দেবী শুক্লবর্ণা বাণী পুস্তকধারিণী ॥ ৫৩।।  
‎      কোটিপূর্ণেন্দুশোভাঢ্যা শরৎপঞ্চজলোচনা।
‎       বহ্নিশুদ্ধাংশুকাধানা রত্বভূষণভূষিতা ॥ ৫৪।।
‎       সম্মিতা সুদতী শ্যামা সুন্দরীনাঞ্চ সুন্দরী। 
  ‎ স্রষ্ট্রী শ্রুতীনাং শাস্ত্রাণাং বিদুষাম জননী পরা ॥৫৫।।
‎         বাগধিষ্ঠাতৃদেবী সা কবীনামিষ্টদেবতা। 
‎       শুদ্ধসত্ত্বস্বরূপা চ শান্তরূপা সরস্বতী ॥ ৫৬।। 
‎     গোবিন্দপুরতঃ স্থিত্বা জগৌ প্রথমতঃ সুখম। 
‎       তন্নামগুণকীর্ত্তিশ্চ বীণয়া সা ননর্ত্ত চ॥ ৫৭।।
‎  
‎         -(ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণঃ ব্রহ্মখন্ড,৩/৫৩-৫৭)
‎অনুবাদঃ তারপর পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণের মুখ হতে বীণাপুস্তকধারিণী শুক্লবর্ণা এক দেবী অবির্ভূত হন। তাঁর সৌন্দর্য্য কোটিপূর্ণচন্দ্রের সদৃশ, এবং চক্ষুদ্বয় শরৎকালীন পদ্মপুষ্প তুল্য। তিনি রত্বভূষণে ভূষিতা। তাঁর পরিধান অগ্নির ন্যায় বিশুদ্ধ, তিনি সুন্দরীদিগের মধ্যে অতিশয় সুন্দরী ও ঈষৎ হাস্য- বিশিষ্টা। তাঁর দন্তপক্তি অতি সুন্দর এবং অঙ্গসকল গ্রীষ্মে সুখশীতল ও শীত সময়ে সুখোঞ্চ। তিনি শ্রুতি(বেদ) ও অন্যান্য শাস্ত্র এবং জ্ঞানীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী। সেই শান্তরূপা শুদ্ধসত্ত্ব-স্বরূপা জগদ্ধাত্রী দেবতাই কবিদিগের ইষ্টদেবতা এবং যিনি সরস্বতী নামে প্রসিদ্ধ। সেই সরস্বতী দেবী প্রথমেই গোবিন্দের(শ্রীকৃষ্ণ)  সম্মুখবর্তিনী হয়ে বীণাবাদনপূর্ব্বক সুখে তাঁর নাম, গুণ ও কীর্তি গান করতে লাগলেন।



ওঁ তরুণ-শকলমিন্দোৰ্ব্বিভ্রতী শুভ্রকাস্তিঃ
কুচভর-নমিতাঙ্গী সন্নিষণা সিতাব্জে।
নিজ-করকমলোদ্যল্লেখনীপুস্তকশ্রীঃ
সকল বিভবসিদ্ধ্যৈ পাতু বাগ্ দেবতা নঃ।

চন্দ্রের তরুণ অংশের ন্যায় যাঁর কান্তি শুভ্র, যিনি কুচভরে অবতাঙ্গী, যিনি শ্বেত পদ্মাসনা, যাঁর নিজ করকমলে উদ্যত লেখনী ও পুস্তক শোভিত, সকল ঐশ্বর্য সিদ্ধির নিমিত্ত সেই বাগদেবী আমাদের রক্ষা করুন।

সরস্বতীর প্রণামঃ

ওঁ সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে।
বিশ্বরূপে বিশালাক্ষি বিদ্যাং দেহি নমোঽস্তু তে॥

হে মহীয়সী বিদ্যাদেবী সরস্বতী, পদ্মফুলের মতো তোমার চক্ষু, তুমি বিশ্বরূপা। হে বিশাল চক্ষুধারণকারী দেবী, তুমি বিদ্যা দান কর। তোমাকে প্রণাম করি।

সরস্বতীকে বাক্ এবং শিল্প কৃষ্টি কলার দেবী বলা হয়, তাতে তাঁর বহুবিধ বৈশিষ্ট্য। তিনি বিভিন্ন নামে ও রূপে পরিচিত। নামগুলো হল- বাক্, বিরাজ, ভারতী, ব্রাহ্মী, পুটকারী, সারদা, বাগীশ্বরী, বেদ মাতা, শতরূপা, পৃথুদক, মহাশ্বেতা, সর্বশুক্লা এবং সরস্বতী। তাঁকে নদীরূপেও বর্ণনা করা হয়েছে। ঋগবেদে বিভিন্ন সূত্রে তাঁর উল্লেখ আছে। এ ছাড়া সাতটি পবিত্র নদীর তিনি অন্যতমা।

দেবী আদ্যা প্রকৃতির তৃতীয় অংশজাতা দেবী সরস্বতী বাক‍্য, বুদ্ধি, বিদ্যা জ্ঞান এই সকলের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। তিনি বোধস্বরূপিণী, সকল সংশয়ছেদিণী সর্ব্বসিদ্ধিপ্রদায়িণী। তিনি সঙ্গীতের সুর ও তাল প্রভৃতির কারণ স্বরূপিণী এবং নিখিল বিশ্বের উপজীবিকা স্বরূপা। জগতে ব্রহ্মা প্রথমে সরস্বতী দেবীকে পূজা করেন। তৎপর ত্রিভূবনে তাঁর পূজা প্রবর্তিত হয়। দেবী সরস্বতী কৃষ্ণের জিহ্বাগ্র হতে আবির্ভূতা হন। তিনি শুক্লবর্ণা, পীতবস্ত্রধারিণী এবং বীণা ও পুস্তকহস্তা। কৃষ্ণাংশভূতা দেবী সরস্বতী নারায়ণের অন্যতম পত্নী ছিলেন। মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে দেবীর পূজা বিহিত হয়। হংস দুধ থেকে তার সারভাগ ক্ষীর গ্রহণ করে, আর অবশিষ্ট জলটুকু ফেলে রাখে। জ্ঞানসাধকেরা সংসারের নিত্যানিত্য থেকে শুধু নিত্যবস্তুই গ্রহণ করেন। তাই হংসই সরস্বতী দেবীর যোগ্য বাহন।

Post a Comment

0 Comments